আমার বাপ মাছ ধরতে গেছিলো জংগলে। আমার বাপরে বাঘ টাইনা নিছে। খাবলা খাবলা মাংস খাইছে। পরে গেরামের সকলে বাপের অার্ধেক শরীরটা নিয়ে আইছে, এমনটি জানালো সাতক্ষীরা গাবুরা এলাকার রশিদ মুন্সির ১৪ বছরের ছেলে।
সুন্দরবনের বাওয়ালী, মাওয়ালী, মৎস্যজীবি, চুনারী, ছুতোর যে কেউ বাঘের শিকার হলে হঠাৎ থমকে যায় পরিবারটি। একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির অনুপস্থিতিতে পরিবারে নেমে আসে দূর্যোগ।
আটত্রিশ বছর বয়সের করিমনন্নেসা তাদেরই একজন। জীবন যুদ্ধে টিকে আছে বটে কিন্তু হারিয়েছে তার স্বামীকে। স্বামীর এক দলা মাংসও মাটি দিতে পাওয়া যায়নি। করিমনন্নেসার তাই সমস্ত রাগ বাঘের উপর। আট বছর ধরে স্বামী হত্যার প্রতিশোধের আগুন আজও জ্বলছে করিমুন্নেসার বুকে। এলাকায় বাঘ ঢুকলে আজও নিজের অজান্তে বলে উঠে, আমারে বাঘটারে একটু মারতি দে। করিমনন্নেসার এক ছেলে ২০০৭ এর সিডরে ভেসে গেলেও ছোট ছেলেটি জানে তার বাবাকে কে মেরেছে।
শ্যামনগরের বাঘ ও মানুষের সংঘাত নিয়ে গবেষনারত একটি সংস্থা জানায়, বাঘ মানুষের সংঘর্ষ অনেকটাই পরিকল্পিত। এমন সংঘর্ষের ফলাফলও সবার জানা থাকে। লোকালয়ে বাঘ ঢুকলে অন্য সবার মতোই মৃত ব্যক্তির স্ত্রী-সন্তানরাও বাঘকে মারার জন্য চড়াও হয়।
অন্যদিকে নানা সময়ে প্রতিবেদন তৈরী করতে গিয়ে জানতে পারি নানা তথ্য। গত দশ বছরের ব্যবধানে বাঘের আক্রমনে প্রায় দুইশত মৃত ব্যক্তির পরিবারের হাজারো স্বজন এখন শক্ত-সামর্থ। লোকালয়ে বাঘ ঢুকলে কোন আইনের তোয়াক্কা না করে এলাকার সবাই এক হয়ে পিটিয়ে বাঘ হত্যা করে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায় ২০১১ সালের ১২ মার্চে ভোর রাতে গোলাখালিতে ঢুকে পড়া বাঘটি খুব অল্প সময়ে পিটিয়ে হত্যা করে এলাকাবাসি। ঘটনাস্থলে বাঘের আক্রমনে নিহত পরিবারের সদস্যের উপস্থিতি বেশি ছিল তা নিশ্চিত করা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের একজন জানায় বাঘ মেরেছি আরও মারবো, যতোবার আসবে ততোবার মারবো। একই ঘটনা ২৩ জানুয়ারী ২০১৮ সকালে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের গুলিশাখালী এলাকায় গ্রামবাসি বাঘটিকে পিটিয়ে হত্যা করে।
লোকালয়ের পরিধি বাড়তে বাড়তে মানুষ এখন বাস করছে সুন্দরবনের বাঘের বাড়িতে। তাই প্রতিনিয়ত দু’পক্ষের মধ্যে কাজ করে এক আ্তংক। কে কখন কার হাতে জীবন দেবে। বৈরী এমন সর্ম্পকের পরও কেউ আবার চায় বাঘ বেঁচে থাকুক। ’বাঘ মারা পড়লে বাঘ পাওয়া যাবে না, আবার বাপ মরলেও বাপ পাওয়া যাবে না। আমার বাপেরে বাঘে নিছে আমার কলিজা পুড়ে, এরপরও বাঘ বেঁচে থাক। গাল গড়িয়ে চোখের জল পড়তে থাকে, মৃত খালেক মিয়ার মাঝ বয়সী ছেলের।






