সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ও চলচ্চিত্র সোনার কেল্লা–য় জটায়ু আর ফেলুদার কথোপকথনে উটের জল সংরক্ষণের প্রসঙ্গটি অনেকেরই মনে আছে। জটায়ু বলেছিলেন, উট নাকি পাকস্থলীতে পানি জমিয়ে মরুভূমিতে চলতে থাকে। তখন ফেলুদা তাকে শুধরে দিয়ে বলেন, উটের কুঁজে জমা থাকে চর্বি, যা অক্সিডাইজ হয়ে পানি তৈরি করে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিজ্ঞান কী বলে?
বিজ্ঞানীদের মতে, উটের কুঁজে সরাসরি পানি জমা থাকে না। সেখানে জমা থাকে চর্বি, যা শক্তি ও পানির উৎস হিসেবে কাজ করে। মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে উটের রয়েছে একাধিক অভিযোজন ক্ষমতা। ড্রোমেডারি ও ব্যাকট্রিয়ান উট একসঙ্গে প্রায় ৩০ গ্যালন পর্যন্ত পানি পান করতে পারে। এমনকি জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যাকট্রিয়ান উট লবণাক্ত পানিও পান করতে সক্ষম।
উটের নাকের ভেতরে জটিল ভাঁজযুক্ত গঠন থাকে, যা শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় পানির অপচয় কমায়। এছাড়া বিশেষ ধরনের রক্তকণিকা তাদের দেহে পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। তবে শুধু উটই নয়, প্রকৃতির আরও অনেক প্রাণী রয়েছে, যারা অভিনব উপায়ে পানি সংরক্ষণ করে বেঁচে থাকে।
দেহই যখন জলাধার
যুক্তরাষ্ট্রের মরুভূমি অঞ্চলের র্যাটল সাপ দীর্ঘ সময় পানি ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। তাই বর্ষাকালে তারা শরীরে পানি ধরে রাখার বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে। তাদের পিঠের খোলসে মাইক্রোস্কোপিক ল্যাবিরিন্থের মতো গঠন থাকে, যা বৃষ্টির পানি আটকে রাখে এবং সহজে গড়িয়ে পড়তে দেয় না। এভাবেই তারা শরীরে পানি সংরক্ষণ করে।
ত্বকেই পানিবাহী নালি
অস্ট্রেলিয়ার আউটব্যাকে বসবাসকারী কাঁটাযুক্ত ডেভিল নামের গিরগিটির ত্বকে রয়েছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নালি। এসব নালি ত্বকে জমা হওয়া সামান্য পানিকেও সরাসরি মুখ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। সাধারণত পিঁপড়া খেয়ে তারা শরীরে আর্দ্রতা পায়, তবে খরার সময় এ বিশেষ ত্বকই তাদের বাঁচিয়ে রাখে।
হাতিয়ার বানিয়ে পানির সন্ধান
মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার কিছু শিম্পাঞ্জি পানির জন্য ব্যবহার করে অভিনব কৌশল। তারা পাতা ভাঁজ করে চামচের মতো বানায় এবং গাছের কোটরে জমে থাকা পানি সংগ্রহ করে পান করে। গবেষকদের মতে, অনেক সময় তারা চিবানো পাতা ও কাদা দিয়ে স্পঞ্জের মতো বস্তু তৈরি করেও পানি শোষণ করে।
সন্তানদের জন্য পানি বহন
মরুভূমির স্যান্ডগ্রাউস পাখিরা সন্তানদের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে পানি নিয়ে আসে। পুরুষ পাখিরা প্রায় ২০ মাইল উড়ে পানির উৎসে যায়। এরপর পেটের পালকে পানি শোষণ করে বাসায় ফিরে বাচ্চাদের পানি পান করায়।
আর্দ্র বীজে টিকে থাকার কৌশল
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ক্যাঙ্গারু ইঁদুর মরুভূমির শুকনো বীজ খেয়ে বেঁচে থাকে। তারা গালভর্তি বীজ মাটির গর্তে জমা করে রাখে। গর্তের আর্দ্রতায় বীজগুলো পানি শোষণ করে, যা পরে তাদের শরীরের পানির চাহিদা পূরণে সহায়তা করে। এদের কিডনিও অত্যন্ত কার্যকরভাবে পানি ধরে রাখতে পারে।
প্রকৃতির প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য প্রাণীদের এসব অভিযোজন বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে। মরুভূমির প্রাণীরা যেন শেখায়- বেঁচে থাকার জন্য প্রকৃতি সব সময়ই নিজস্ব পথ খুঁজে নেয়।






