শিশুখাদ্য থেকে মাছ-মাংস, নিরাপদ নয় কোনো খাবারই

ফলমূল, শাকসবজি, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে শিশুখাদ্য- ভেজাল থেকে মুক্ত নয় কোনো খাদ্যপণ্যই। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় এখন যেন একটাই বাস্তবতা, ভেজাল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যে মেশানো বিভিন্ন রাসায়নিক ও ভারী ধাতু মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। কারণ, তাদের শরীর ক্ষতিকর উপাদানের প্রতিক্রিয়া প্রতিরোধে তুলনামূলক দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে এসব খাবার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য না করে বরং মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)। তবে তাদের তথ্যই বলছে, বাজারে ভেজালের মাত্রা উদ্বেগজনক।

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে ১ হাজার ৭৫৬টি খাদ্যনমুনা পরীক্ষা করে বিভিন্ন পণ্যে পটাশিয়াম অ্যালুমিনিয়াম সালফেট, সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট ও সারফেস অ্যাকটিভের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক এবং ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসবের অনেকগুলোই খাদ্যে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ভেজাল হিসেবে গণ্য।

আচার, সস, চিপস, মুড়ি, ফলের রস, শিশুদের জুস, চানাচুর, মরিচ-হলুদের গুঁড়া, ঘি, পাউডার দুধ, সরিষার তেল, মাখন, সয়াবিন তেল, ডালডা ও মধুসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে এসব অনিয়ম ধরা পড়েছে। পরীক্ষিত চিপসের ৬৫ শতাংশে অ্যাক্রিলামাইড পাওয়া গেছে, যা ভাজা বা পোড়ানোর ফলে তৈরি হওয়া ক্ষতিকর রাসায়নিক।

বিএফএসএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষিত ১ হাজার ৭৫৬টি নমুনার মধ্যে ৫৮৬টিতে, অর্থাৎ ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ খাদ্যে ভেজাল বা দূষণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১১২টি নমুনায় সরাসরি ভেজাল উপাদান শনাক্ত হয়েছে। ৮২টি খাদ্যপণ্যের পরীক্ষায় দেখা গেছে, গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি নিষিদ্ধ ডিডিটি ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান রয়েছে।

এ ছাড়া ৩৫ শতাংশ ফলে এবং ৫০ শতাংশ শাকসবজিতে কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। চালের ১৩টি নমুনায় অতিমাত্রায় আর্সেনিক এবং পাঁচটিতে ক্রোমিয়াম শনাক্ত হয়েছে। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় সিসাসহ ভারী ধাতু এবং লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়া গেছে। মাছ ও মুরগিতেও ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি মিলেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেজাল খাদ্যে থাকা ক্ষতিকর উপাদান ধীরে ধীরে মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল করে দেয়। এমনকি ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির সঙ্গেও এসব খাবারের সম্পর্ক রয়েছে। মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকির ঘাটতির সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা উৎপাদন থেকে বাজারজাত পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে অতিমুনাফা করছে।

সম্প্রতি খাবারের স্বাদ ও সুগন্ধির জন্য ব্যবহৃত কেওড়া ও গোলাপজল পরীক্ষায়ও অননুমোদিত রাসায়নিক শনাক্ত করা হয়েছে। পরে এসব পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয় বিএফএসএ।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ড. মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, ‘ভেজাল খাবার প্রতিরোধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। বাজার থেকে বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রীর নমুনা সংগ্রহ করে প্রতি মাসে পরীক্ষা করা হয়। নিজস্ব ল্যাব না থাকায় রাজধানীর সরকারি বিভিন্ন পরীক্ষাগারে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধ করে পরীক্ষাগুলো করে থাকে। এ ছাড়া দেশের সব জেলা থেকে প্রতি মাসে দুটি নমুনা পাঠানোর নির্দেশনা রয়েছে। জেলাগুলোয় মাত্র তিনজন কর্মী দিয়ে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। জনবল সংকটের কারণে মনিটরিংয়ে কিছুটা সমস্যা হয়।’

সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বাইরে থেকে কেনা খাবারে বিভিন্ন অস্বাস্থ্যকর উপাদান মেশানো হয়। শরীরের জন্য ক্ষতিকর রং, প্রিজারভেটিভ, ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। মুখরোচক করার জন্য অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করা হয়। এসব উপাদান মানুষকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে। লিভারের সমস্যার পাশাপাশি কিডনির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এসব খাবার। অনেক উপাদান দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত তৈরি করে এবং দুরারোগ্য রোগ জন্ম দেয়। তাই এসব খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে। বাড়িতে স্বাস্থ্যকর উপায়ে বানানো খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হসপিটালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘খাদ্য আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। আর ভেজাল খাদ্য এ লক্ষ্য পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভেজাল খাদ্য খেলে আমাদের হজমে সমস্যা থেকে শুরু করে পাতলা পায়খানা ও ক্যানসারের মতো জটিল রোগও দেখা দেয়। খাদ্যের সঙ্গে মেশানো ক্ষতিকর বিভিন্ন পদার্থ আমাদের লিভার ও কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা ধীরে ধীরে নষ্ট করে ফেলে। এভাবে একসময় লিভার-কিডনি অকেজো হয়ে যায়। পাকস্থলীতে প্রদাহ হয়। শরীরে অ্যালার্জি দেখা দেয়। শরীর ফুলে যায়। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হয়ে যায়।’

সম্প্রতি প্রকাশিত পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ ক্যানসারে, ২ লাখ কিডনি রোগে এবং দেড় লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া গর্ভবতী মায়েদের মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২০১২ সালে দিনাজপুরে কীটনাশকমিশ্রিত লিচু খেয়ে ১৪ শিশুর মৃত্যু এবং ২০১৫ সালে আরও ৮ শিশুর প্রাণহানির ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা মো. আসলাম বলেন, ‘বাসা থেকে সকালে বের হয়ে ফিরতে রাত হয়। প্রায় সময়ই খাবার বাইরে খেতে হয়। বাইরের খাবারে ভেজাল থাকে সেটা জানি। কিন্তু কী করব? ভেজালমুক্ত খাবার তো পাচ্ছি না।’

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

আরও পড়ুন

থামছে না জাহাজভাঙা শ্রমিকের মৃত্যু: ২২ বছরে প্রাণ গেছে ২৭৯, আহত...

গ্রিন শিপইয়ার্ডে রূপান্তরের পরও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের প্রাণহানি থামছে না। আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতার মধ্যেও ঘটছে একের পর এক...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

তালের পিঠা কেন হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির ঘর থেকে?

ভাদ্র মাসে তালের পিঠা, খুব স্বাভাবিকভাবেই একসময় ঘরে ঘরে থাকার কথা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। শহরের বাজারে কচি শাঁসের জন্য...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

মজুরি ৫০০ টাকা দাবিতে কর্মসূচি, শ্রীমঙ্গলে চা শ্রমিকদের ওপর হামলার অভিযোগ

চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবিতে কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে লেবার হাউসের সড়কে আন্দোলনকারীদের ওপর চা শ্রমিক নেতাদের হামলার অভিযোগ...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

দীঘিনালায় সোলেমানের পেছনে কারা? কার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে চলছে পাহাড় কাটার এই দুঃসাহসী...

মো. আল আমিন, দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের উত্তর রশিকনগর এলাকায় পেলুডার দিয়ে পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া বেআইনিভাবে মঙ্গলবার...
দূষণ ও দখল
0
minutes
spot_imgspot_img