দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনায় প্রাণঘাতী হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত এক বছরে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসে ৩২ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যা ২০১৮ সালের পর সর্বোচ্চ।
সম্প্রতি ‘এমভি হোন্ডিয়াস’ নামের একটি ক্রুজ শিপে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এবং দুই পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। জাহাজটি আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে যাত্রা শুরু করে বর্তমানে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ–এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
আর্জেন্টিনার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে শুরু হওয়া বর্তমান মৌসুমে এখন পর্যন্ত ১০১ জন হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। গত মৌসুমে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫৭। একই সঙ্গে মৃত্যুহারও গত বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের কারণে এই সংক্রমণ বাড়ছে। সাধারণত সংক্রমিত ইঁদুরের মূত্র বা বিষ্ঠার সংস্পর্শে এলে মানুষের শরীরে হান্টাভাইরাস ছড়ায়। তবে দীর্ঘমেয়াদি খরা, অতিবৃষ্টি ও চরম আবহাওয়ার কারণে ইঁদুরের বংশবিস্তার ও নতুন এলাকায় বিচরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে আর্জেন্টিনার উত্তর-পশ্চিম, উত্তর-পূর্ব, কেন্দ্র এবং দক্ষিণাঞ্চল হান্টাভাইরাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। তবে চলতি মৌসুমে বুয়েনস আইরেসসহ কেন্দ্রীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে।
ক্রুজ শিপে মারা যাওয়া ডাচ দম্পতি আর্জেন্টিনার মিশনস ও নেউকুয়েনসহ বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেছিলেন। চিকিৎসকদের ধারণা, তারা ‘আন্দিজ স্ট্রেইন’ নামের বিরল হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এই ধরনটি নিবিড় সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে সক্ষম।
জাহাজে বিভিন্ন দেশের নাগরিক থাকায় নতুন কোনো বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা–এর মহাপরিচালক ড. তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, এটি কোভিড-১৯–এর মতো মহামারি নয়। হান্টাভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে বা সাধারণ চলাফেরায় ছড়ায় না; বরং আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘ সময় নিবিড় সংস্পর্শে থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
স্পেনের তেনেরিফে বন্দরে জাহাজটি পৌঁছানোর পর যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, পর্যটন এলাকায় ঝোপঝাড় পরিষ্কার না রাখা এবং বনাঞ্চলে মানুষের আনাগোনা বাড়ার কারণে ঝুঁকি বাড়ছে। আর্জেন্টিনার স্বাস্থ্য বিভাগ উশুয়াইয়ার বন্য ইঁদুরের নমুনা সংগ্রহে বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বনের আগুন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যপ্রাণী লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসছে। ফলে মানুষের সঙ্গে তাদের সংস্পর্শ বাড়ছে, যা হান্টাভাইরাসের মতো জুনোটিক রোগ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বন্য পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।






