বর্জ্যের ভারে নাকাল বগুড়া, দুই দশকেও হয়নি স্থায়ী সমাধান

সড়কের পাশে ময়লার স্তূপ। পচা বর্জ্য থেকে ছড়াচ্ছে উৎকট দুর্গন্ধ। কাক-কুকুরের টানাটানিতে আবর্জনা ছড়িয়ে পড়েছে পথজুড়ে। কোথাও ময়লার সঙ্গে মিশে আছে পলিথিন, প্লাস্টিক ও খাবারের উচ্ছিষ্ট; কোথাও সেই বর্জ্য গড়িয়ে নালা পেরিয়ে পড়ছে করতোয়া নদীতে। পথচারীরা নাক চেপে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন।

বগুড়া শহরের বনানী রেশম উন্নয়ন বোর্ড সড়ক, ঠনঠনিয়া, নাটাইপাড়া, সেউজগাড়ী, রেলস্টেশন, শিববাটি ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয়সহ বিভিন্ন এলাকায় এমন দৃশ্য এখন নিত্যদিনের। দিনের শেষে বর্জ্যের স্তূপ আরও বড় হয়। পরদিন আবার সেখানে যুক্ত হয় নতুন ময়লা। অথচ এসব বর্জ্য আধুনিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত বা নিরাপদে নিষ্পত্তির কোনো ব্যবস্থা নেই।

প্রতিদিন ২৫০ টন বর্জ্য

বগুড়া শহরে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ টন বর্জ্য তৈরি হলেও তা প্রক্রিয়াজাত বা নিষ্পত্তির আধুনিক কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে শহরের ১৭টি অস্থায়ী ট্রান্সফার স্টেশনেই দিনের পর দিন জমে থাকছে বিপুল পরিমাণ আবর্জনা।

সিটি করপোরেশনের কনজারভেন্সি শাখার তথ্য অনুযায়ী, নগরে বর্তমানে ১৭২টি কমিউনিটিবেজড অর্গানাইজেশন (সিবিও) বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের কাজে যুক্ত। প্রতিদিন ১৮টি গার্বেজ ট্রাকে শতাধিক ট্রিপ দিয়ে এসব বর্জ্য সরিয়ে নেওয়া হলেও পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদে নিষ্পত্তির স্থায়ী কোনো সুরাহা হয়নি।

অথচ ২০০৭ সালের আগে শহরের মহল্লায় মহল্লায় স্থায়ী ডাস্টবিন ছিল। পরিবেশ সুরক্ষার কথা বলে পরে সেগুলো তুলে দিয়ে ভ্রাম্যমাণ ডাস্টবিন ও সিবিওভিত্তিক বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা চালু করা হয়। বর্জ্য সংগ্রহের পর তা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিষ্পত্তির যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল, তা গত প্রায় দুই দশকেও বাস্তবায়িত হয়নি।

ফলে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করা হলেও শেষ পর্যন্ত এর বড় অংশ জমছে অস্থায়ী ভাগাড়ে। কোথাও শেড থাকলেও বর্জ্য পড়ে থাকছে খোলা অবস্থায়। কাক-কুকুরের টানাটানিতে তা ছড়িয়ে পড়ছে সড়কে। আবার বৃষ্টির পানিতে বর্জ্যের ময়লা-আবর্জনা গড়িয়ে ঢুকছে আশপাশের নালা ও জলাশয়ে।

শহরের প্রাণকেন্দ্রের সপ্তপদী মার্কেট, রাজাবাজার, ফতেহ আলী বাজারসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকাতেও প্রতিদিন ময়লার স্তূপ জমছে। এসব বর্জ্যের একটি অংশ সরাসরি করতোয়া নদীতে গিয়ে পড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

রাজাবাজারের ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন দোকানের সামনে ময়লার স্তূপ জমে। দুর্গন্ধে ক্রেতারা দাঁড়াতে চান না। অনেককে নাক চেপে চলাচল করতে হয়।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী আছাদুল হক বলেন, ‘অফিসের সামনের সড়কে সারাক্ষণ ময়লা পড়ে থাকে। দুর্গন্ধের কারণে সামনের রাস্তা ব্যবহার না করে পেছনের রাস্তা দিয়ে অফিসে যাতায়াত করতে হয়।’

শিববাটি এলাকার বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘ময়লার ভাগাড়ের পাশে শিল্পকলা একাডেমি ও আমাদের বাড়ি। দুর্গন্ধে শিশুদের বমি পর্যন্ত হয়।’

সিটি করপোরেশনের কনজারভেন্সি শাখার সুপারভাইজার মামুনুর রশিদ বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে শতাধিক ট্রিপে প্রায় ২৫০ টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়। তবে জনবল সংকট বড় সমস্যা। বর্তমানে ৬৭১ জন কর্মীর মধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন ৩১৭ জন। এত কম জনবল দিয়ে পুরো শহর পরিষ্কার রাখা কঠিন।’

সেউজগাড়ীর বাসিন্দা নাসিমা আক্তারের প্রশ্ন, ‘বাসা থেকে ময়লা নিয়ে গিয়ে যদি আবার শহরের অন্য পাশে ফেলে রাখা হয়, তাহলে লাভ কী? দূষণ তো শহরে থেকে যাচ্ছে।’

স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে

প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য সংগ্রহ করছে সিটি করপোরেশন। সংগ্রহের পর এর বড় অংশের শেষ ঠিকানা অস্থায়ী ভাগাড়। সেখানে বর্জ্য পড়ে থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে সড়কে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পৌঁছে যাচ্ছে করতোয়া নদীতে।

ফলে শহর পরিষ্কারের নামে এক জায়গার ময়লা অন্য জায়গায় সরানো হলেও বর্জ্যের পরিবেশগত সংকট থেকে যাচ্ছে শহরের বুকেই। বগুড়ার জন্য তাই এখন প্রশ্ন শুধু ‘ময়লা কে সরাবে’- তা নয়; বরং ২৫০ টন বর্জ্যের নিরাপদ ও স্থায়ী ব্যবস্থাপনা কবে হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

বিডি ক্লিনের পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গৃহস্থালি, শিল্প ও হাসপাতালের বর্জ্যে সিসা, ক্যাডমিয়াম, সালফার, অ্যামোনিয়া, নাইট্রোজেনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান থাকতে পারে। এসব বর্জ্য খোলা স্থানে পড়ে থাকলে মাটি, পানি ও বায়ু দূষিত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ও বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) বগুড়া শাখার সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, ‘এত বড় শহরে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকা অত্যন্ত হতাশাজনক। উন্মুক্ত বর্জ্য করতোয়া নদী, মাটি ও বাতাস–সবকিছুকেই দূষিত করছে।’

প্রকল্প আছে, বাস্তবায়ন নেই

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট সমাধানে বর্জ্য থেকে জৈব সার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব পরিকল্পনার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি।

এদিকে নগরের সবচেয়ে বড় ভাগাড় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বাঘোপাড়ার একটি স্থান। সেটিও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে সেখানে বর্জ্য ফেলার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাঈদ আলী বলেন, ‘জনবল সংকট রয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে বড় প্রকল্প প্রয়োজন। এ জন্য বিভিন্ন সংস্থার কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বলেন, ‘আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও বগুড়ার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে আধুনিক প্লান্ট স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বড় জায়গার অভাব রয়েছে।’

ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অপসারণের পরও এর নিরাপদ ও স্থায়ী নিষ্পত্তির সমাধান হচ্ছে না। অস্থায়ী ভাগাড়, খোলা বর্জ্য ও নদীতে আবর্জনা পড়ার এই চক্রে একদিকে যেমন নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে দূষিত হচ্ছে মাটি, পানি ও বায়ু। বগুড়ার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখন তাই জরুরি হয়ে উঠেছে দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশসম্মত স্থায়ী সমাধান।

সূত্র: সমকাল

আরও পড়ুন

থামছে না জাহাজভাঙা শ্রমিকের মৃত্যু: ২২ বছরে প্রাণ গেছে ২৭৯, আহত...

গ্রিন শিপইয়ার্ডে রূপান্তরের পরও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের প্রাণহানি থামছে না। আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতার মধ্যেও ঘটছে একের পর এক...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

কক্সবাজারের মহেশখালীতে ঝড়ে ট্রলারডুবি, দুই জেলের মৃত্যু, নিখোঁজ ২

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় ঝড়ের কবলে পড়ে মাছ ধরার ট্রলার ডুবে দুই জেলের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও দুই জেলে নিখোঁজ রয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর)...
জাতীয়
0
minutes

তালের পিঠা কেন হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির ঘর থেকে?

ভাদ্র মাসে তালের পিঠা, খুব স্বাভাবিকভাবেই একসময় ঘরে ঘরে থাকার কথা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। শহরের বাজারে কচি শাঁসের জন্য...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes

মজুরি ৫০০ টাকা দাবিতে কর্মসূচি, শ্রীমঙ্গলে চা শ্রমিকদের ওপর হামলার অভিযোগ

চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবিতে কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে লেবার হাউসের সড়কে আন্দোলনকারীদের ওপর চা শ্রমিক নেতাদের হামলার অভিযোগ...
কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাবার
0
minutes
spot_imgspot_img