নতুন একটি গবেষণায় সুন্দরবনে কুমির সংরক্ষণে আশার আলো

সুন্দরবনের নদী, খাল আর নোনা পানির বিস্তীর্ণ জগতে নিঃশব্দে ভেসে থাকে এক প্রাগৈতিহাসিক শিকারি- লোনা পানির কুমির। কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর জলাভূমিতে টিকে থাকা এই প্রাণী আজও সুন্দরবনের বন্য প্রকৃতির অন্যতম প্রতীক। কিন্তু বাংলাদেশে এই কুমিরের সংখ্যা একসময় এতটাই কমে গিয়েছিল যে, প্রজাতিটিকে টিকিয়ে রাখতে এখনো সংরক্ষণবিদদের নানা উদ্যোগ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় নতুন একটি গবেষণা সুন্দরবনের লোনা পানির কুমির সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনার কথা বলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বন্দিদশায় জন্ম নেওয়া বা দীর্ঘদিন বন্দিদশায় বেড়ে ওঠা কুমিরকে বনে ছেড়ে দিলে তারা আগের প্রজননকেন্দ্র বা আবাসস্থলে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা নাও করতে পারে। অর্থাৎ, বড় আকারের বন্দিদশায় বেড়ে ওঠা কুমিরকেও বন্য পরিবেশে পুনঃপ্রবর্তনের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

প্রাণিজগতে নিজের পরিচিত আবাসস্থলে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা বা ‘হোমিং বিহেভিয়ার’ বেশ পরিচিত। পাখি হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে পুরোনো বাসায় ফিরে আসে। সামুদ্রিক প্রাণীও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জন্মস্থান বা প্রজননস্থলে ফিরে যায়। কুমিরের মধ্যেও এমন প্রবল ঘরে ফেরার প্রবৃত্তি রয়েছে।

মারডক বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণগত পরিবেশবিদ রু সোমাওয়েরার নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় এই আচরণটি নতুনভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সুন্দরবনে পাঁচটি পরিণত লোনা পানির কুমিরের শরীরে স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং যন্ত্র বসিয়ে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকরা।

এই পাঁচটির মধ্যে তিনটি ছিল বন্দিদশায় বেড়ে ওঠা স্ত্রী কুমির। তারা ৮ থেকে ২২ বছর পর্যন্ত বন্দিদশায় ছিল। অন্য দুটি ছিল বন্য কুমির। এর একটি স্থানীয় এলাকায় ধরে একই স্থানে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর অন্যটি, জংরা নামের কুমিরটিকে, তার পুরোনো অবস্থান থেকে প্রায় ১৩২ কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এসেছে বন্দিদশায় বেড়ে ওঠা তিন কুমিরের কাছ থেকে। বনে ছেড়ে দেওয়ার পর তাদের কেউই পুরোনো প্রজননকেন্দ্র বা বন্দিদশার আবাসস্থলে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেনি।

বরং তারা সুন্দরবনের নতুন পরিবেশে ছোট ও নির্দিষ্ট এলাকায় অবস্থান করে চলাফেরা করেছে। তাদের চলাফেরার ধরন স্থানীয় বন্য কুমিরের সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

গবেষকদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা। কারণ এতদিন কুমির সংরক্ষণে বনে পুনঃপ্রবর্তনের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্ন ছিল, বন্দিদশায় বেড়ে ওঠা কুমির কি নতুন পরিবেশকে নিজেদের আবাসস্থল হিসেবে গ্রহণ করবে, নাকি পুরোনো জায়গায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করবে?

গবেষণার ফলাফল অন্তত এই পাঁচটি কুমিরের ক্ষেত্রে প্রথম সম্ভাবনার পক্ষেই ইঙ্গিত দিয়েছে।

তবে জংরার আচরণ ছিল একেবারেই আলাদা। তাকে নিজের পুরোনো এলাকা থেকে ১৩২ কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পর সে তার আগের আবাসস্থলের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

যদিও গবেষণার সময় সে সেখানে পৌঁছাতে পারেনি, তার চলাফেরার ধরন ছিল স্পষ্টতই ‘ঘরে ফেরার’ প্রবণতাসম্পন্ন। অন্য কুমিরগুলোর তুলনায় জংরা প্রতিদিন অনেক বেশি দূরত্ব অতিক্রম করেছে এবং বিশাল এলাকা ঘুরেছে। কোনো কোনো দিনে সে ৩০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ অতিক্রম করেছে।

এটি দেখিয়ে দেয়, বন্য পরিবেশ থেকে ধরে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া কুমিরের ক্ষেত্রে শুধু নতুন জায়গায় ছেড়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের পুরোনো আবাসস্থলে ফিরে যাওয়ার প্রবল প্রবণতা থাকলে পুনঃস্থাপন কর্মসূচি ব্যর্থ হতে পারে।

বাংলাদেশে লোনা পানির কুমিরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল সুন্দরবন। একসময় চামড়ার জন্য ব্যাপক বাণিজ্যিক শিকারের কারণে দেশে এই প্রাণীর সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে যায়। ১৯৭৩ সাল থেকে প্রজাতিটি আইনগতভাবে সুরক্ষিত হলেও জনসংখ্যার কাঙ্ক্ষিত পুনরুদ্ধার এখনো ঘটেনি।

সর্বশেষ জরিপে সুন্দরবনে প্রজননক্ষম লোনা পানির কুমিরের সংখ্যা মাত্র ১৪০টি বলে অনুমান করা হয়েছে। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; সুন্দরবনের একটি শীর্ষ শিকারি প্রাণীর সংকটেরও প্রতিচ্ছবি।

কুমির খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদী, খাল ও মোহনার জলজ পরিবেশে শিকারি হিসেবে তাদের উপস্থিতি পুরো বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই কুমির সংরক্ষণ মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুন্দরবনের জলজ ও স্থলজ পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্য।

এতদিন কুমির পুনঃপ্রবর্তনের ক্ষেত্রে সাধারণত বাচ্চা কুমির ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাচ্চা কুমিরের বেঁচে থাকার হার কম এবং প্রজননক্ষম হতে তাদের দীর্ঘ সময় লাগে।

সেই জায়গায় বন্দিদশায় বেড়ে ওঠা বড় কুমিরকে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নতুন একটি পথ খুলে দিতে পারে। তবে এর আগে আরও বেশি সংখ্যক কুমির নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন। কোন বয়সে, কোন পরিবেশে এবং কোন এলাকায় তাদের অবমুক্ত করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে, এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজে বের করতে হবে।

গবেষণাটি যেন সুন্দরবনের কুমির সংরক্ষণে একটি ছোট দরজা খুলে দিয়েছে। সেই দরজার ওপারে হয়তো অপেক্ষা করছে একটি নতুন সম্ভাবনা, বন্দিদশায় বেড়ে ওঠা কুমিরও একদিন সুন্দরবনের নদী-খালের স্বাধীন জীবনে নিজেদের নতুন ‘ঘর’ খুঁজে নিতে পারে।

কারণ সংরক্ষণের শেষ লক্ষ্য শুধু প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখা নয়; তাদের এমন একটি বন্য পৃথিবী ফিরিয়ে দেওয়া, যেখানে তারা নিজেদের মতো করে বাঁচতে পারে।

আরও পড়ুন

চ্যাম্পিয়নশিপ হার, তবু পাখির প্রাণ বাঁচিয়ে বড় জয় অধিনায়কের

একটি সিগাল পাখিকে বাঁচাতে ফুটবল মাঠে সিপিআর দেওয়ার চেষ্টা করে প্রশংসায় ভাসছেন তুরস্কের এক অধিনায়ক। সেদিন ছিল রবিবার। ইস্তাম্বুলের ফুটবল মাঠে চলছিল জমজমাট লড়াই। মুখোমুখি...
জাতীয়
0
minutes

সুন্দরবনে হরিণ শিকারের ফাঁদ ও নিষিদ্ধ জালসহ গ্রেপ্তার ৬

সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের হলদী খালে অভিযান চালিয়ে হরিণ শিকারের ফাঁদ ও নিষিদ্ধ খালপাটা জালসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে বন বিভাগ। এ সময়...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes

গারো পাহাড়ে আটকা ১৩৫ হাতি, করিডর চালুর পরিকল্পনা পরিবেশমন্ত্রীর

মেঘালয় থেকে আসা প্রায় ১৩০ থেকে ১৩৫টি বন্যহাতি সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার কারণে নিজ দেশে ফিরতে পারছে না বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes

১৯৪ বছরের কচ্ছপ জোনাথন: যার জিনে মিলল দীর্ঘায়ুর সম্ভাব্য সূত্র

বয়স প্রায় ১৯৪ বছর। অথচ খাবারের প্রতি আগ্রহ কমেনি, জীবনযাপনও চলছে স্বাভাবিক ছন্দে। দুই বিশ্বযুদ্ধ, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনসহ দেড় শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসের সাক্ষী অ্যালডাব্রা...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes
spot_imgspot_img