চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ড্রেন দিয়ে বের হচ্ছে কালচে তৈলাক্ত বর্জ্য। সেই বর্জ্য মিশছে পাশের মইল্ল্যা খালে। প্রায় তিন কিলোমিটার প্রবাহিত হওয়ার পর খালটি গিয়ে মিশেছে সাঙ্গু নদে। এতে খালের পানি, আশপাশের কৃষিজমি ও নদীর জলজ জীববৈচিত্র্য দূষণের ঝুঁকিতে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
সাতকানিয়া উপজেলার কালিয়াইশ ইউনিয়নে অবস্থিত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) দোহাজারী-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রের পোড়া ফার্নেস অয়েলের স্লাজ থেকে এ দূষণ ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি অংশে মইল্ল্যা খালের পানি কালচে হয়ে গেছে। খালের পানি, পাশের গাছপালা ও লতাপাতায় লেগে আছে কালো স্লাজ। পানি থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। খাল দিয়ে প্রবাহিত তেলমিশ্রিত বর্জ্য শেষ পর্যন্ত সাঙ্গু নদে গিয়ে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর পর থেকেই কেন্দ্রের ভেতর থেকে বের হওয়া কালো স্লাজ খালের পানিতে মিশছে। ২০১১ সালের শুরুতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হয়। কেন্দ্রটির প্রায় ৩০০ মিটার পূর্বে উত্তর কালিয়াইশের মইল্যার ডেবা জলাধার এলাকা থেকে মইল্ল্যা খালের উৎপত্তি। খালটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষিণ পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে মলেয়াবাদ গ্রামের চাগাচর এলাকায় সাঙ্গু নদে মিশেছে।
কৃষিকাজ ব্যাহত, কমেছে জলজ প্রাণী
স্থানীয় বাসিন্দা ও উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একসময় মইল্ল্যা খালের পানি ব্যবহার করে খালের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকার দুই পাশে শতাধিক কৃষক প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করতেন। তবে দূষণসহ নানা কারণে বর্তমানে চাষাবাদ কিছুটা কমেছে। স্থানীয়দের দাবি, খালের পানি এখন আর কৃষিকাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি খালে মাছসহ জলজ প্রাণীর সংখ্যাও কমে গেছে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামে বন্যার সময় খাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে জমে থাকা স্লাজ আশপাশের কৃষিজমি ও লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। এরপর বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন তাঁরা। গত ১২ সেপ্টেম্বর স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধন করেন। পরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপকের কাছে লিখিত অভিযোগও দেন তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রায় ১০ দিন আগে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ খাল থেকে পোড়া তেলের স্লাজ অপসারণের কাজ শুরু করেছে। এতে খালে জমে থাকা স্লাজের পরিমাণ কিছুটা কমেছে।
কালিয়াইশ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল গফুর বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য সরাসরি খালে পড়া বন্ধ না হলে শুধু খাল পরিষ্কার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বর্জ্য কোথা থেকে বের হচ্ছে, কীভাবে তা খালে যাচ্ছে এবং এর পরিশোধনের ব্যবস্থা কী, এসব বিষয় তদন্ত করে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
সাঙ্গু নদেও দূষণের আশঙ্কা
নদী গবেষক ও বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, ‘মইল্ল্যা খালটি সাঙ্গু নদের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে পোড়া তেলের স্লাজ বৃষ্টির পানি ও জোয়ারের স্রোতের সঙ্গে সাঙ্গু নদে পৌঁছাচ্ছে। এতে নদীর পানি ও জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফার্নেস অয়েল ও তেলজাতীয় বর্জ্য পানিতে মিশলে পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘খাল ও নদে পোড়া তেলের স্লাজ ফেলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এতে মাছসহ জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে। উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে এটি বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’
‘অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা’ বলছে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ
খালে বর্জ্য পড়ার ঘটনাকে ‘অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা’ উল্লেখ করেছেন দোহাজারী-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. আবদুল মান্নান।
তিনি বলেন, ‘অতিবৃষ্টি ও ওভারফ্লোর কারণে কিছু পানিমিশ্রিত ফার্নেস অয়েলের স্লাজ খালে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগের পর আমরা শ্রমিক নিয়োগ করে বর্জ্য অপসারণের কাজ শুরু করেছি। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধ করতে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের সঙ্গে আমরা বসব এবং তাঁদের সমস্যার সমাধান করব।’
কালিয়াইশ ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. ইসমাইল বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রটি আমাদের জন্য সম্পদ। তবে এটি দ্বারা স্থানীয় বাসিন্দারা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটিও খেয়াল রাখতে হবে। খালে জমে থাকা কালচে তৈলাক্ত বর্জ্য অপসারণ শুরু করায় স্থানীয় লোকজন কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে এটির স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক মঈনুদ্দিন ফয়সাল বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও দূষিত স্থান পরিদর্শন করে পানির নমুনা সংগ্রহ করেছি। দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। পরীক্ষার ফল পেতে কয়েক দিন সময় লাগবে। তারপর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
সূত্র: প্রথম আলো






