বনরুইয়ের আঁশই কাল, পাচারের ফাঁদে পৃথিবীর একমাত্র আঁশযুক্ত স্তন্যপায়ী

প্রতি তিন মিনিটে একটি বনরুই চোরাশিকারিদের হাতে ধরা পড়ে, বনরুই পাচারের ভয়াবহতা বোঝাতে বহুল প্রচারিত এই পরিসংখ্যান প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। তবে পরিসংখ্যানটির বর্তমান নির্ভুলতা নিশ্চিত করার মতো হালনাগাদ তথ্য নেই। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের কারণে পৃথিবীর অন্যতম অনন্য প্রাণী বনরুই আজ অস্তিত্বের সংকটে।

বনরুই পৃথিবীর একমাত্র আঁশযুক্ত স্তন্যপায়ী প্রাণী। এশিয়া ও আফ্রিকায় এদের আটটি স্বীকৃত প্রজাতি রয়েছে। শরীরের ওপরের অংশ শক্ত আঁশে ঢাকা, যা তৈরি হয় কেরাটিন নামের প্রোটিন দিয়ে। মানুষের চুল ও নখেও একই উপাদান রয়েছে।

বিপদ টের পেলে বনরুই নিজের শরীর গুটিয়ে বলের মতো হয়ে যায়। শক্ত আঁশে ঢাকা শরীর দিয়ে শিকারির আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। অথচ আত্মরক্ষার এই প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যই মানুষের লোভের কারণে তার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, বনরুইয়ের আঁশ ও মাংসের চাহিদাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক অবৈধ বাণিজ্যচক্র।

আঁশ ও মাংসের চাহিদায় শিকার

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বনরুইয়ের মাংস খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, এর আঁশ ঐতিহ্যবাহী কিছু চিকিৎসাপদ্ধতিতে ব্যবহারের জন্য বিক্রি করা হয়। তবে এসব চিকিৎসায় বনরুইয়ের আঁশের কার্যকারিতার পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

তারপরও আঁশ ও মাংসের চাহিদা মেটাতে বনরুই শিকার করা হচ্ছে। শিকার করা প্রাণী কিংবা এর দেহাংশ এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাচার করা হচ্ছে। এতে বন্য পরিবেশে বনরুইয়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

বন্যপ্রাণী বাণিজ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ট্রাফিক ও আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ৬৭টি দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বনরুই পাচারের তথ্য উঠে আসে। ওই সময়ে অন্তত ১ হাজার ২৭০টি জব্দের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। আন্তর্জাতিক পাচারের ১৫৯টি বাণিজ্যপথও শনাক্ত করা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়েও বনরুই পাচারের হুমকি অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৭৫টি দেশে বনরুইজাত পণ্য জব্দের ঘটনায় আনুমানিক পাঁচ লাখের বেশি বনরুইয়ের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ হিসাব জব্দ হওয়া চালানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ফলে পাচার হওয়া সব প্রাণী বা পণ্য এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। অর্থাৎ, প্রকৃত পাচারের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ

বনরুইয়ের জীবনযাপনের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পিঁপড়া ও উইপোকা শিকার। লম্বা, আঠালো জিহ্বার সাহায্যে মাটির নিচে কিংবা গাছের গায়ে থাকা পোকামাকড় সংগ্রহ করে খায় প্রাণীটি। এর ফলে পিঁপড়া ও উইপোকার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।

প্রাকৃতিক পরিবেশে পোকামাকড়ের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বনরুই মাটি ও বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়ও ভূমিকা রাখে। তাই বনরুই হারিয়ে গেলে শুধু একটি প্রাণীই বিলুপ্তির পথে যাবে না, এর প্রভাব পড়তে পারে সংশ্লিষ্ট বাস্তুতন্ত্রেও।

আট প্রজাতিই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে

বনরুইয়ের আটটি স্বীকৃত প্রজাতিই আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের লাল তালিকায় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বিভিন্ন শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত। অবৈধ শিকার, পাচার এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থলের ক্ষতি এদের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০১৭ সাল থেকে বনরুইয়ের সব প্রজাতিকে বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক কনভেনশনের প্রথম পরিশিষ্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম ছাড়া বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষিদ্ধ।

তবে কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা থাকলেই পাচার বন্ধ হয়ে যায় না। অবৈধ বাণিজ্যচক্র শনাক্ত করা, সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো, আইন কার্যকর করা এবং বন্যপ্রাণীর অংশবিশেষের চাহিদা কমানোর উদ্যোগও প্রয়োজন।

বনরুই বাঁচাতে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ

বনরুই রক্ষায় প্রথমেই বন্ধ করতে হবে অবৈধ শিকার ও পাচার। একই সঙ্গে এর আঁশ ও মাংসের চাহিদা কমাতে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বনরুইয়ের আবাসস্থলে মানুষের অনুপ্রবেশ ও অন্যান্য চাপ কমানোর পাশাপাশি পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

বনরুই কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। মানুষের লোভে এই প্রাচীন প্রাণীটি যেন পৃথিবী থেকে হারিয়ে না যায়, সে জন্য এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

ইলিশের উৎপাদন কমছে কেন, বাড়াতে সরকারের নতুন উদ্যোগ

দেশের নদ-নদী ও উপকূলীয় জলসীমায় ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। জাটকা নিধন বন্ধ, মা ইলিশ সংরক্ষণ, আইন প্রয়োগ জোরদার, নদীর নাব্য...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes

গুলশানে পোষা কুকুরের মৃত্যুতে মামলা: গাড়ি শনাক্ত, তদন্তে পুলিশ

রাজধানীর গুলশানে চার বছর বয়সী পোষা কুকুর কাইকে গাড়িচাপা দিয়ে চলে যাওয়ার ঘটনায় একটি টয়োটা ফরচুনার গাড়ি শনাক্ত করেছে পুলিশ। গাড়িটির নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ...
জাতীয়
0
minutes

চ্যাম্পিয়নশিপ হার, তবু পাখির প্রাণ বাঁচিয়ে বড় জয় অধিনায়কের

একটি সিগাল পাখিকে বাঁচাতে ফুটবল মাঠে সিপিআর দেওয়ার চেষ্টা করে প্রশংসায় ভাসছেন তুরস্কের এক অধিনায়ক। সেদিন ছিল রবিবার। ইস্তাম্বুলের ফুটবল মাঠে চলছিল জমজমাট লড়াই। মুখোমুখি...
জাতীয়
0
minutes

সুন্দরবনে হরিণ শিকারের ফাঁদ ও নিষিদ্ধ জালসহ গ্রেপ্তার ৬

সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের হলদী খালে অভিযান চালিয়ে হরিণ শিকারের ফাঁদ ও নিষিদ্ধ খালপাটা জালসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে বন বিভাগ। এ সময়...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes
spot_imgspot_img