ইলিশের উৎপাদন কমছে কেন, বাড়াতে সরকারের নতুন উদ্যোগ

দেশের নদ-নদী ও উপকূলীয় জলসীমায় ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। জাটকা নিধন বন্ধ, মা ইলিশ সংরক্ষণ, আইন প্রয়োগ জোরদার, নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং জেলেদের সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে ইলিশের টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে নতুন একটি প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে এর কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান ও নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা, প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ ও অনুপযুক্ত জাল ব্যবহার বন্ধ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে মাছ আহরণের ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে সংরক্ষণ কার্যক্রমে জেলেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাঁদের জীবিকা ও ইলিশ রক্ষার উদ্যোগের মধ্যে ভারসাম্য থাকে।

মৎস্যবিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে বাড়ার পর দেশের ইলিশের উৎপাদন গত দুই অর্থবছরে কমেছে। এর পেছনে একক কোনো কারণ নয়; বরং নির্বিচার জাটকা আহরণ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা, নদীর নাব্য সংকট, দূষণ, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন এবং সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপ সম্মিলিতভাবে কাজ করছে।

নতুন প্রকল্পে বাড়ছে জেলেদের সহায়তা

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপপরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার নতুন করে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের’ মেয়াদ শেষ হলেও নতুন প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে শিগগিরই কাজ শুরু হবে।

তিনি জানান, নতুন প্রকল্পের নাম ‘মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে ইলিশের টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প’। এতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা এবং জেলেদের কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলেদের জন্য সরকারের বিশেষ খাদ্যসহায়তা কর্মসূচি ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিংয়ের (ভিজিএফ) আওতায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে ভিজিএফ সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ ৪৬ হাজার করার কথা বলা হয়েছে।

চলতি বছরও ইলিশ আহরণ কমের দিকে উল্লেখ করে আবুল কালাম আজাদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার কারণে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের উৎপাদনে ওঠানামা হতে পারে। তবে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে আগামী বছরগুলোতে ইলিশের উৎপাদন বাড়তে পারে বলে তিনি আশাবাদী।

নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সবার অংশগ্রহণ জরুরি

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, এটি সবার দায়িত্ব। সম্মিলিতভাবে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা গেলে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে এবং জেলেরা দীর্ঘ মেয়াদে এর সুফল ভোগ করবেন।

তিনি বলেন, ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ ও ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য। ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার ঘোষিত ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। যেকোনো মূল্যে এ সময়ে ইলিশ ধরা বন্ধ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত টহল, নৌযান পর্যবেক্ষণ ও অভিযান চালানোর পাশাপাশি নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। শুধু জেলেদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না, অবৈধ মাছ আহরণের সঙ্গে যুক্ত পুরো ব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে।

উৎপাদন কমার পেছনে একাধিক কারণ

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান ও সামুদ্রিক বিজ্ঞান অনুষদের মাছ আহরণ ও আহরণ-পরবর্তী প্রযুক্তি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মাসুদ রানা বলেন, ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয়। জাটকা আহরণ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা, ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার, নদীর নাব্য হ্রাস, পানিদূষণ, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপ—সব মিলিয়ে ইলিশসম্পদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি জানান, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার টন, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন কমে প্রায় ৫ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ উৎপাদন প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কম।

কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বাড়ার পর সাম্প্রতিক সময়ে তা কমে যাওয়ায় ইলিশসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

ড. মাসুদ রানা বলেন, সরকারি বিধান অনুযায়ী, শিল্প ট্রলারের মাছ ধরার ক্ষেত্রে ৪০ মিটার গভীরতার বাইরের জলসীমার শর্ত রয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ে নির্ধারিত গভীরতার ভেতরে ট্রলিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। এ ছাড়া সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল ও অনুপযুক্ত জাল ব্যবহারের কারণে ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের মাছ একসঙ্গে ধরা পড়ে। এতে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ প্রজননক্ষম হওয়ার আগেই আহরিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় জোর

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে প্রজননক্ষম মা ইলিশ রক্ষাকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছেন ড. মাসুদ রানা। তাঁর মতে, একটি মা ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে পরবর্তী প্রজন্মের বিপুলসংখ্যক ইলিশ জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

এ জন্য শুধু নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই চলবে না। নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে টহল, নৌযান পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। পাশাপাশি নদীতে বর্জ্য ফেলা, পানিদূষণ, নাব্য হ্রাস এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

তিনি বলেন, কোথায় ইলিশ বেশি ডিম ছাড়ে, কোন সময়ে বেশি আসে এবং পরিবেশগত কী কী পরিবর্তন এর প্রজননে প্রভাব ফেলে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত।

বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক মৎস্য ও জলজ চাষ বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল ওহাব বলেন, দেশে ইলিশের উৎপাদন গত দুই বছর ধরে কমছে। ২০১৬ সালে ৩ লাখ ৯৬ হাজার টন উৎপাদনের মধ্য দিয়ে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা শুরু হয়েছিল। এরপর প্রতি অর্থবছরে উৎপাদন ১০ থেকে ২০ হাজার টন করে বেড়েছে। তবে গত দুই বছর ধরে তা কমছে।

তাঁর মতে, দেশে বছরে সাড়ে ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ টন ইলিশ আহরণ করা গেলে তা টেকসই উৎপাদনের সীমার মধ্যে থাকবে।

অধ্যাপক আব্দুল ওহাবের বিবেচনায়, উৎপাদন কমার পেছনে বড় দুটি কারণ হলো প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা এবং নির্বিচারে জাটকা নিধন। মা ইলিশ রক্ষায় অক্টোবরে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নিষেধাজ্ঞার সময় কিছুটা পিছিয়ে নেওয়া প্রয়োজন কি না, তা গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত।

তিনি বলেন, অতীতে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কয়েকটি উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রেখেছিল। এর মধ্যে ছিল মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, আট মাস জাটকা আহরণ নিষিদ্ধ রাখা, মার্চ ও এপ্রিলে অভয়াশ্রমে মাছ ধরা বন্ধ রাখা, সাড়ে ৬ সেন্টিমিটারের কম ফাঁসের জাল নিষিদ্ধ করা এবং নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের চালসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া।

২০০৫ সালে পাঁচটি অভয়াশ্রম নির্ধারণ করা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব অভয়াশ্রমের কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ এখন জরুরি।

অধ্যাপক আব্দুল ওহাবের মতে, পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায় ডিম ছাড়ার পর মার্চ-এপ্রিলে জাটকা ঝাঁকে ঝাঁকে সাগরের দিকে যেতে থাকে। এ সময় নদ-নদীতে নিষিদ্ধ জাল এবং উপকূলীয় সাগরে অগভীর পানিতে চলাচলকারী ট্রলারের মাধ্যমে ব্যাপক হারে জাটকা নিধন করা হয়। এতে ইলিশ পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় না।

জাটকা নিধনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, নদী দখল ও দূষণের ফলে বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হচ্ছে। নাব্য সংকটও ইলিশের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিচরণে বাধা সৃষ্টি করছে।

সূক্ষ্ম জালে ধরা পড়ছে ছোট ইলিশ

মৎস্যবিজ্ঞানীদের বক্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় উপকূলের জেলেদের অভিজ্ঞতায়ও। বিষখালী নদীতে মাছ ধরা কয়েকজন জেলে মো. লিটন হোসেন, মো. কাইয়ুম ও নিরু খানের ভাষ্য, ইলিশের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর সূক্ষ্ম জালে সেগুলো ধরে ফেলা হয়।

তাঁদের দাবি, প্রথমে একেবারে ছোট মাছ স্থানীয়ভাবে ‘চাপিলা মাছ’ নামে বাজারে বিক্রি হয়। পরবর্তী সময়ে তুলনামূলক বড় ফাঁসের কারেন্ট জালেও ছোট ইলিশ ধরা পড়ে। শেষ পর্যায়ে বড় ট্রলিং ট্রলার এবং কাঠের নৌকাকে রূপান্তর করে তৈরি ট্রলারে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ বেহুন্দি জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা হয়। ফলে ইলিশ পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে না।

জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা ছাড়াও নোয়াখালীর হাতিয়া, ভোলা ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ইলিশ ধরা হচ্ছে।

নদীদূষণে কমছে ইলিশের খাদ্য

ইলিশের উৎপাদন ও আকার কমে যাওয়ার সঙ্গে নদীর খাদ্যব্যবস্থারও সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় ইলিশের খাদ্য হিসেবে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদকণা ও প্রাণিকণার উপস্থিতি উঠে এসেছে। গবেষণাটিতে ইলিশের খাদ্যতালিকায় ২৭ প্রজাতির উদ্ভিদকণা ও ১২ প্রজাতির প্রাণিকণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মেঘনা নদীতে এসব খাদ্যকণার পরিমাণ ৬৮ শতাংশ কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে নদীদূষণকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের গবেষণায় পদ্মা ও মেঘনার মোহনায় ইলিশের প্রয়োজনীয় খাদ্যকণা আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসার বিষয়টি উঠে এসেছে। এর প্রভাব ইলিশের আকারের ওপরও পড়ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে নদীর পানির গুণাগুণ রক্ষা, শিল্পবর্জ্য ও অন্যান্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বজায় রাখা জরুরি। মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষার পাশাপাশি খাদ্য ও বেড়ে ওঠার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত না করলে শুধু আহরণে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার পরামর্শ

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন ড. মাসুদ রানা। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উপগ্রহচিত্র, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা, পানির গুণাগুণ পর্যবেক্ষণকারী সেন্সর এবং মাছের উপস্থিতি শনাক্তের আধুনিক প্রযুক্তি সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

উপগ্রহচিত্র ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থার মাধ্যমে ইলিশের বিচরণ, প্রজনন ও পোনা বেড়ে ওঠার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্রশিক্ষার সাহায্যে পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, নদীর প্রবাহ এবং অন্যান্য পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণ করে ইলিশের গতিবিধি ও সম্ভাব্য সমাগমের পূর্বাভাস দেওয়া যেতে পারে।

এ ছাড়া নদী ও মোহনায় সেন্সরের মাধ্যমে পানির গুণাগুণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ডিএনএ বিশ্লেষণ ও পানির নিচে শব্দতরঙ্গভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইলিশের উপস্থিতি ও মজুদ নির্ণয় এবং আকাশযান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারির মাধ্যমে অবৈধ মাছ আহরণ শনাক্ত করা যেতে পারে।

জিপিএসভিত্তিক নৌযান পর্যবেক্ষণ, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় উপযোগী মাছ ধরার সরঞ্জাম, ডিজিটাল মাছ আহরণের তথ্যভান্ডার এবং জলবায়ু পরিবর্তনভিত্তিক পূর্বাভাসব্যবস্থা চালুরও পরামর্শ দেন তিনি। এসব প্রযুক্তি সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে একটি আধুনিক ইলিশসম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে অবৈধ আহরণ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘ মেয়াদে ইলিশের প্রাকৃতিক মজুদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

গুজরাটের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ

ভারতের গুজরাট রাজ্যের নর্মদা নদীর মোহনা ও ভরুচ অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। ইলিশ গবেষকদের মতে, এ পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিবৃষ্টির ফলে নর্মদা নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি, মোহনা অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিবর্তন এবং ইলিশের চলাচলের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি। তবে গুজরাটে উৎপাদন বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

ড. মাসুদ রানা বলেন, গুজরাটের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা, তেঁতুলিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ নদী অববাহিকার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও মোহনার পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও গুজরাটের নদী ও মোহনা অঞ্চলের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণও প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর প্রবাহ, লবণাক্ততা, প্রজননক্ষেত্র এবং ইলিশের চলাচলের মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে পারলে সংরক্ষণ ও আহরণের সময় নির্ধারণ আরও কার্যকর হতে পারে।

ইলিশের ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের জীবিকা

ইলিশ শুধু বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি ও খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ নয়; উপকূলীয় জেলে এবং মৎস্যনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবিকারও বড় উৎস। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণে নিয়োজিত। পরিবহন, বাজারজাতকরণ, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজে আরও প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত।

ইলিশে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে, যা মানবদেহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০২৪ সালের বিশ্ব মৎস্য ও জলজ চাষ পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিঠাপানির মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় এবং চাষের মাছ উৎপাদনে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ইলিশ আহরণেও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ।

২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ফলে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাকৃতিক মজুদ রক্ষা অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, জীবিকা এবং দেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

সব মিলিয়ে, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নদীর পরিবেশ সংরক্ষণ, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষা, নিষিদ্ধ জাল নিয়ন্ত্রণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং জেলেদের বিকল্প জীবিকা ও সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ইলিশের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষা এবং দীর্ঘ মেয়াদে এ সম্পদের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করার পথ তৈরি হতে পারে।

সূত্র: বাসস

আরও পড়ুন

বনরুইয়ের আঁশই কাল, পাচারের ফাঁদে পৃথিবীর একমাত্র আঁশযুক্ত স্তন্যপায়ী

প্রতি তিন মিনিটে একটি বনরুই চোরাশিকারিদের হাতে ধরা পড়ে, বনরুই পাচারের ভয়াবহতা বোঝাতে বহুল প্রচারিত এই পরিসংখ্যান প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। তবে পরিসংখ্যানটির বর্তমান...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes

গুলশানে পোষা কুকুরের মৃত্যুতে মামলা: গাড়ি শনাক্ত, তদন্তে পুলিশ

রাজধানীর গুলশানে চার বছর বয়সী পোষা কুকুর কাইকে গাড়িচাপা দিয়ে চলে যাওয়ার ঘটনায় একটি টয়োটা ফরচুনার গাড়ি শনাক্ত করেছে পুলিশ। গাড়িটির নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ...
জাতীয়
0
minutes

চ্যাম্পিয়নশিপ হার, তবু পাখির প্রাণ বাঁচিয়ে বড় জয় অধিনায়কের

একটি সিগাল পাখিকে বাঁচাতে ফুটবল মাঠে সিপিআর দেওয়ার চেষ্টা করে প্রশংসায় ভাসছেন তুরস্কের এক অধিনায়ক। সেদিন ছিল রবিবার। ইস্তাম্বুলের ফুটবল মাঠে চলছিল জমজমাট লড়াই। মুখোমুখি...
জাতীয়
0
minutes

সুন্দরবনে হরিণ শিকারের ফাঁদ ও নিষিদ্ধ জালসহ গ্রেপ্তার ৬

সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের হলদী খালে অভিযান চালিয়ে হরিণ শিকারের ফাঁদ ও নিষিদ্ধ খালপাটা জালসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে বন বিভাগ। এ সময়...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes
spot_imgspot_img