জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত চার দশকে হিমালয় পর্বতমালার হিমবাহগুলোর প্রায় এক-চতুর্থাংশ গলে গেছে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রায় উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলতে থাকায় বাড়ছে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও হিমবাহ-সৃষ্ট বন্যার ঝুঁকি। এর সঙ্গে হিমালয়জুড়ে অপরিকল্পিত নির্মাণ, বনভূমি ধ্বংস ও পাহাড় কেটে সুড়ঙ্গ নির্মাণ অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে সতর্ক করছেন গবেষকরা।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খরা, দাবানল, বন্যা ও ভূমিধসে জনজীবন বিপর্যস্ত। এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে নেপালেও। সম্প্রতি উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল থেকে হিমবাহের বরফ ও পাথরের বিশাল খণ্ড উপত্যকায় আছড়ে পড়ার পর সৃষ্ট প্রবল স্রোত বাড়িঘর, যানবাহনসহ বিস্তীর্ণ এলাকার বিভিন্ন স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযানও বৈরী আবহাওয়া ও ধ্বংসস্তূপের কারণে কঠিন হয়ে পড়েছে।
নিউজিল্যান্ডের ভূতত্ত্ববিদ সিমন কক্স বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে পানির স্রোত এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে যে তা পাহাড়ের গা বেয়ে কয়েক মিটার পর্যন্ত উঠে যায়। উচ্চতা থেকে কয়েক টন ওজনের পাথর নিচে পড়ে দীর্ঘ পথজুড়ে বড় ধরনের বিপদ তৈরি করতে পারে। ফলে এমন দুর্যোগের পর উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
সিমন কক্সের মতে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুত গলিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন জমাট থাকা মাটি ও শিলাস্তর গলতে থাকায় পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর ফলে বরফ, পানি, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ মিশে অত্যন্ত ঘন ও শক্তিশালী প্রবাহ তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলে যাওয়ার ঝুঁকি দিন দিন গুরুতর হচ্ছে। পারমাফ্রস্ট গলে গেলে শিলাস্তরও দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন পাহাড়ধসের গতি ঘণ্টায় ১০০ থেকে ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা তার পথে থাকা প্রায় সবকিছুই ভাসিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম।
গবেষকদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড হিমালয়ের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ২০১৯ সালের একটি গবেষণাতেও তুষারধসের কারণে হিমবাহ ভেঙে আকস্মিক বন্যা বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাডের (GLOF) ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।
গবেষণা অনুযায়ী, গত চার দশকে হিমালয়ের হিমবাহগুলোর প্রায় এক-চতুর্থাংশ গলে গেছে। ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে এই গলন আরও তীব্র হতে পারে। ফলে হিমবাহসংলগ্ন উপত্যকা ও নদী অববাহিকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য ঝুঁকি বাড়বে।
গবেষকদের মতে, হিমালয়জুড়ে উন্নয়নের নামে বনভূমি ধ্বংস, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও সুড়ঙ্গ খোঁড়ার মতো কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও ভূমিধস মোকাবিলা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
হিমালয়ের হিমবাহ শুধু বরফের স্তূপ নয়; এ অঞ্চলের অসংখ্য নদী ও জনপদের পানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া শুধু পাহাড়ি এলাকার জন্য নয়, নিম্নাঞ্চলের কোটি মানুষের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও দুর্যোগঝুঁকি তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় তাই হিমালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে।






