সিলেটের রাজেন্দ্রপুর দত্তপাড়ার শ্যামল বৈদ্যের কুকুরটি গত তিন মাস ধরে এক অমানবিক অবস্থায় আছে। শ্যামল কুকুরটির গলায় ভারি গাছের ডাল বেঁধে রেখেছেন, যার ফলে কুকুরটি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছে না। তার দেহের তুলনায় ডালটি এত ভারি যে কেবল টান দিয়ে সামান্য সামনের দিকে হাঁটতে পারে। দিনে-রাতে কেবল এই অবস্থাতেই থাকতে হয়। খাওয়াটুকুই কুকুরটির একমাত্র ভরসা।
এলাকাবাসি শ্যামলকে এই নিষ্ঠুর আচারের জন্য সতর্ক করলেও তিনি কোনওভাবে মানছেন না। এক পর্যায়ে কেউ কুকুরটির বিভৎস ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে। মুহূর্তেই ছবি ছড়িয়ে পড়ে। ছবিটি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ হলেও, কেউ সঠিক ঠিকানা খুঁজে পাননি।
ঢাকার এ্যানিমেল লাভার ও রেসকিউয়ার হারিস বুলবুল ছবিটি দেখে একটি ক্লু পেয়ে সিলেটে যান। ধাপে ধাপে গ্রামে অনুসন্ধান করে, ছবি দেখিয়ে তিনি কুকুরটির অবস্থান শনাক্ত করেন। একরাতে কুকুরটির সঠিক ঠিকানায় পৌঁছান।

হারিস মালিকের সঙ্গে দেখা করেন, কিন্তু শ্যামল কুকুরটি কাউকে দিতে নারাজ। শ্যামল গ্রামের আরও ২০–২৫ জন মানুষ জড়িত করে কুকুর দেবেনা বলে বাধা দেন। ফলে হারিস ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন।
এরপর হারিস বুঝতে পারেন, কেন শ্যামল কুকুরটিকে এত বড় ডাল দিয়ে গলায় বেঁধে রেখেছেন। জানা যায়, শ্যামল হিন্দু পাড়ার বাসিন্দা, আর পাশের পাড়া মুসলিম। দুই পরিবারের মধ্যে ঝগড়া আছে, কারণ কুকুরটি বাড়ির বাইরে গিয়ে মুরগি, হাঁস, ছাগলও মারছে এবং মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে। এলাকাবাসি repeatedly শ্যামলকে কুকুরটি সরানোর জন্য বললেও তিনি তা সহ্য করতে পারেননি।
শ্যামল আগে একই কুকুরটিকে কয়েকবার অন্য জায়গায় ফেলে এসেছেন। একবার বাড়ির পাশের খালের ওপাড়েও ফেলে এসেছেন। কিন্তু প্রভুভক্ত কুকুরটি আবারও বাড়িতে ফিরে আসে। শ্যামল এর প্রতিশোধ হিসেবে তিন মাস ধরে গলায় ভারি ডাল বেঁধে রাখেন, যাতে কুকুরটির উপর শাস্তি চলতে থাকে।

এই অবস্থায় কুকুরটির মেরুদণ্ড ও গলার হাড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হারিস জানতে পারেন যে, শ্যামল এমন অত্যাচার করলেও নিজে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। দুইপক্ষের মানসিক প্রতিশোধের কারণে কুকুরটির ওপর এই অমানবিক আচারের অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
এরপর হারিস চিন্তা করেন, যদি এলাকার কাউন্সিলর এবং দলের নেতা/মন্ত্রী সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়, তাহলে কাজটি সহজ হবে। সেই ভাবনা অনুযায়ী, তারা স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সহায়তা পেলে হারিসের কাজ কিছুটা সহজ হয়।
পরেরদিন হারিস আবার দত্তপাড়ায় পৌঁছান। এবারও শ্যামল কুকুরটি দিতে নারাজ। কাউন্সিলর থাকলেও কুকুরটিকে চিকিত্সার জন্য দেওয়া হবে না। হারিস জানতে পারেন, শ্যামল কুকুরটিকে এই কাণ্ড করার কারণ হলো বাড়ির বাইরে কুকুরটির আচরণ। শ্যামল কুকুরটি বাড়ির ভিতরে কোনো মুরগি বা ছাগল ধরে না। তবে বাইরে গিয়ে ঝগড়া শুরু করলে এলাকাবাসি এবং পার্শ্ববর্তী পরিবাররা অভিযোগ করেন, এবং শ্যামল কুকুরটিকে কঠোর শাস্তি দেয়।
এলাকাবাসি repeatedly কুকুরটিকে নিরাপদে রাখতে চেষ্টা করলেও, শ্যামল ও কিছু গ্রামবাসীর বাধার কারণে তারা ব্যর্থ হন। কুকুরটি জীবনের জন্য সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় আসে। হারিস এবং তার টিম কেবল চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন।
শেষপর্যায়ে, শ্যামল ও এলাকাবাসীর সঙ্গে লিখিত চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, কুকুরটিকে চিকিৎসা করানো হবে এবং নিরাপদে রাখা হবে, যাতে কেউ কুকুরটিকে আবার অমানবিকভাবে নির্যাতন করতে না পারে।
কুকুরটির মেরুদণ্ডে এমন ক্ষতি হয়েছে, যা পুরোপুরি সেরে ওঠা সম্ভব নাও হতে পারে। হারিস এবং তার টিমের তত্ত্বাবধানে কুকুরটির চিকিৎসা শুরু হয়েছে। এই যাত্রায় কুকুরটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে, এবং হারিস ও তার সহকর্মীদের প্রচেষ্টার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।






