“মৌমাছি, মৌমাছি
কোথা যাও নাচি নাচি
দাঁড়াও না একবার ভাই।”
কবি নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের জনপ্রিয় এই ছড়ার মৌমাছিকে আমরা সবাই চিনি। কালো, হলুদ ও বাদামি রঙের মিশেলে ছোট্ট এ প্রাণীটি গুনগুন শব্দ তুলে ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ায়। মধু সংগ্রহই যেন তার প্রধান কাজ। তবে জানো কি, পৃথিবীর সব মৌমাছি কিন্তু মধু সংগ্রহ করে না!
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, পৃথিবীর মাত্র ১০ শতাংশ মৌমাছি দলবদ্ধভাবে রানিসহ মৌচাক তৈরি করে এবং মধু সংগ্রহ করে। অধিকাংশ মৌমাছি মাটির নিচে গর্ত করে কিংবা মৃত গাছের ফাঁপা অংশে বাসা বানায়। আবার কিছু মৌমাছি অন্য মৌমাছির ফাঁকা বাসায় গোপনে ডিমও পাড়ে। আরও অবাক করা বিষয় হলো, কিছু প্রজাতির মৌমাছি পচা মাংস খেয়েও বেঁচে থাকে।
ধাঁধার সমাধানেও দক্ষ
মৌমাছি শুধু পরিশ্রমী নয়, অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণীও। গবেষণায় দেখা গেছে, তারা গন্ধ, নকশা এমনকি মানুষের মুখও মনে রাখতে পারে। ইঁদুরের মতো গোলকধাঁধা বা ধাঁধার সমাধান করতেও সক্ষম মৌমাছি।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, মৌমাছিরা আত্মসচেতন এবং প্রতিদিন ছয় থেকে দশ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমায়। এমনকি তারা স্বপ্নও দেখতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
পৃথিবীকে তারা দেখে ভিন্নভাবে
মানুষের মতো মৌমাছির চোখে পৃথিবী এক রকম নয়। মানুষের চোখে মৌলিক রং তিনটি—লাল, সবুজ ও নীল। কিন্তু মৌমাছিরা দেখে নীল, সবুজ ও অতিবেগুনি রং। মানুষের তুলনায় তাদের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হলেও অতিবেগুনি আলোতে ফুলের সূক্ষ্ম নকশা তারা সহজেই দেখতে পায়।
উড়ন্ত অবস্থায় প্রায় ২৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে না এলে ফুলের খুঁটিনাটি তাদের চোখে স্পষ্ট হয় না। তবে দূর থেকেই তারা রঙের পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে। তাই ঘাসের ভেতর লুকিয়ে থাকা ফুলও সহজে খুঁজে পায় মৌমাছি।
মধু সংগ্রহকারী মৌমাছির ঘ্রাণশক্তি মানুষের চেয়ে প্রায় শতগুণ বেশি।
একে অন্যের কাছ থেকেও শেখে
কানাডীয় গবেষক পিটার কেভান ও ব্রিটিশ গবেষক লার্স চিটকার এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাম্বল বি বা ভোমরা মৌমাছি সুতা টেনে প্লাস্টিকের ডিস্ক সরিয়ে মিষ্টি পানিতে পৌঁছতে শিখেছিল।
আরও আশ্চর্যের বিষয়, অন্য মৌমাছিরা খাঁচার ভেতর থেকে এ দৃশ্য দেখে পরে নিজেরাও একই কৌশল ব্যবহার করতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ মৌমাছিরা সামাজিকভাবে শেখার ক্ষমতা রাখে।
খাদ্য উৎপাদনে মৌমাছির ভূমিকা
ছোট্ট এই প্রাণীটি প্রকৃতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফুলে ফুলে ঘুরে পরাগায়নের মাধ্যমে উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে মৌমাছি। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য উৎপাদন মৌমাছির পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্ব অর্থনীতিতেও মৌমাছির অবদান বিশাল। গবেষণায় বলা হয়, মৌমাছির মাধ্যমে হওয়া পরাগায়নের বার্ষিক অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ৫৭৭ বিলিয়ন ডলার।
ক্ষুদ্র হলেও মৌমাছি তাই প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময়।






