বনহীন জীবনের লড়াই

লেখা: এম এ আজিজ

এক দশক আগে যশোরের চৌগাছায় এক ভোরে বাঁশঝাড়ে দেখা মিলেছিল একা একটি হনুমানের। বিস্ময় জেগেছিল, প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের কেশবপুর থেকে কীভাবে দলছুট হয়ে এখানে এল সে? গাছ থেকে গাছে ঘুরে বেড়ানো সেই প্রাণী তখন স্থানীয় লোকজনের কাছে হয়ে উঠেছিল কৌতূহলের কেন্দ্র।

প্রাইমেট বর্গের এই স্তন্যপায়ী প্রাণী বাংলায় হনুমান নামে পরিচিত। ইংরেজিতে আমরা বলি ‘নর্দান প্লেইনস গ্রে ল্যাঙ্গুর’, ‘কমন ল্যাঙ্গুর’ বা ‘বেঙ্গল স্যাক্রেড ল্যাঙ্গুর’। বাংলাদেশে যে তিন প্রজাতির হনুমান আছে, তার মধ্যে একমাত্র এই প্রজাতির হনুমান যশোরের কেশবপুর ও মনিরামপুর উপজেলার কিছু গ্রামে বসবাস করে। অন্য দুই প্রজাতি বাস করে বনাঞ্চলে। আইইউসিএনের লালতালিকায় এরা বিপন্ন প্রজাতি।

দক্ষিণ এশিয়ায় গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদের মধ্যবর্তী অঞ্চলে এই হনুমানের বিস্তৃতি সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশ ছাড়া ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এই হনুমানের বসবাস। ভারতে বসতবাড়ির আশপাশ ছাড়াও বেশ কিছু বনাঞ্চলে এদের দেখা যায়। এ ছাড়া নেপালেও আছে এই হনুমান।

কেশবপুর ও মনিরামপুরে মানুষের বসতবাড়ির আশপাশে এরা বহু বছর ধরে বাস করে আসছে। ১৮৬৭ সালের দিল্লি গেজেট অনুসারে, কোনো এক সময় এক হিন্দু পুণ্যার্থী এক জোড়া হনুমান সঙ্গে নিয়ে জলঙ্গী নদীর পাড়ে এসে বসতি গড়েন। সেই হনুমান থেকে বর্তমানের কেশবপুর ও মনিরামপুরের হনুমানের উৎপত্তি বলে ধারণা। জলঙ্গী নদী ভারতের মুর্শিদাবাদের পদ্মা থেকে উৎপন্ন হয়ে ভাগীরথী নদীতে মিলিত হয়েছে। এই জলঙ্গী নদী থেকে যশোরের দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার।

বেশ আগে হনুমানের ওপর গবেষণা করতে কেশবপুরে যাই। আমাদের দেখে নানা বয়সের মানুষ জড়ো হলেন। তাঁদের সঙ্গে হনুমান নিয়ে কথা বলি। বুঝতে পারি, খাদ্য ও আবাসের সংকট থাকলেও স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে হনুমানের দ্বন্দ্ব অতটা প্রকট নয়। ফসল ও ফলফলাদির কিছুটা ক্ষতিসাধন করলেও এদের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ এখনো হারিয়ে যায়নি।

ছিপছিপে গড়ন, লম্বা হাত, অতি দীর্ঘকায় লেজ, সেই সঙ্গে বলিষ্ঠ কটিদেশ এদের। এই বিশেষ গড়নের কারণে বৃক্ষচারী জীবনে এরা বেশ ভালোভাবে অভিযোজিত হয়েছে। এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফ দিয়ে ২০ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত অতিক্রম করতে পারে। বুকে কিংবা পিঠে সদ্য–ভূমিষ্ঠ বাচ্চাকে নিরাপদ রেখেই মা হনুমান এমন লম্বা দূরত্বে লাফ দেয়। মাটিতে চলাচলের সময় অন্যান্য চতুষ্পদ প্রাণীর মতোই এরা ’চার পায়ে’ হাঁটে।

হনুমানের গায়ে কিছুটা লম্বা ধূসর বর্ণের লোম থাকে। মুখমণ্ডল, হাত–পায়ের তালু ও আঙুল কালো। ভারতের করবেট টাইগার রিজার্ভে দেখা হনুমানের গায়ের রং সাদাটে মনে হয়েছে। এদের দেহ ১৮ থেকে ৩১ ইঞ্চি লম্বা আর লেজ ৩২ থেকে ১১২ ইঞ্চি লম্বা। পুরুষ হনুমানের ওজন ১৭ থেকে ২০ কেজি আর স্ত্রীর ওজন ১০ থেকে ১৬ কেজি হতে পারে। সারা বছরের যেকোনো সময় সন্তান প্রসব করে। বছরে একটি বাচ্চা হয়।

হনুমানের পারিবারিক কাঠামো বেশ চমকপ্রদ। হনুমান দলে বাস করে। দলে গড়ে সদস্যসংখ্যা ১৩, তবে ২০টি হনুমানও একসঙ্গে থাকতে পারে। একটি বলিষ্ঠ ও শক্তিমান পুরুষ হনুমানের অধিনায়কত্বে তিন-চারটি স্ত্রী হনুমান তাদের বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে পরিবার গঠন করে। এই অধিকর্তা পুরুষ তার দলে অন্য কোনো পুরুষ হনুমানের উপস্থিতি সহ্য করে না। পুরুষ বাচ্চারা বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবার থেকে তাদের বিতাড়িত করে নিজের আধিপত্য ধরে রাখে।

এক দলের সঙ্গে আরেক দল মুখোমুখি হলে মারামারি বাধে। দলের পুরুষ হনুমান এই হাঙ্গামায় নেতৃত্ব দেয়। মারামারির সময় লম্ফঝম্ফ করে, গাছের ডালাপালা ঝাঁকিয়ে বিরোধীদের হুমকি দেয়। দাঁত বের করে ভেংচি কাটে।

স্থানীয় মানুষের সঙ্গে হনুমানের সম্পর্ক বেশ শান্তিপূর্ণ। তবে আগন্তুকের প্রতি কিছুটা রূঢ় আচরণ করে। অনেক সময় ভয় দেখায়। তবে কেশবপুরে বসবাসকারী হনুমানের প্রতি স্থানীয় মানুষের মধ্যে তীব্র কোনো বৈরীভাব আছে বলে মনে হয়নি।

বন না থাকায় এদের টিকে থাকা এখন পুরোপুরি নির্ভর করে মানুষের তৈরি পরিবেশের ওপর। ফসলের ক্ষতি সত্ত্বেও স্থানীয় লোকজনের সহমর্মিতা এখনো তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। তবে খাদ্য ও আবাসের সংকট বাড়লে এই সহাবস্থান কত দিন টিকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

  • এম এ আজিজঅধ্যাপকপ্রাণিবিদ্যা বিভাগজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

*সূত্র: প্রথম আলো

আরও পড়ুন

শ্রীমঙ্গলের রাজাপুরে কুকুরের আক্রমণে আহত বন্যপ্রাণী উদ্ধার

ঝলক দত্ত, শ্রীমঙ্গল : বাঁচার জন্য প্রাণপণে ছুটছিল ছোট্ট প্রাণীটি। কিন্তু পিছু নেয় একদল কুকুর। শেষ পর্যন্ত কুকুরের আক্রমণে গুরুতর আহত হয়ে রাস্তার পাশে পড়ে...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes

দেশি-পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণে পটুয়াখালীর দশমিনায় দ্বিতীয় পাখির কলোনি ঘোষণা

দেশি ও পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণের লক্ষ্যে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় ‘বিহঙ্গ বিলাস’ নামে দ্বিতীয় পাখির কলোনি ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes

চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে নিরাপত্তা জালে আটকা বিশাল অজগর উদ্ধার

চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পূর্ব চরণদ্বীপের বটতল এলাকায় একটি বাগানের নিরাপত্তা জালে আটকা পড়া বিশাল আকৃতির একটি অজগর সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। সাপটি আটকা পড়ার খবর পেয়ে...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes

বিশ্ব প্রাইমেট দিবস আজ: প্রাইমেট সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান

অনলাইন ডেস্ক : প্রাইমেট বা বানরজাতীয় প্রাণীদের সংরক্ষণ, তাদের আবাসস্থল রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পালিত হচ্ছে বিশ্ব প্রাইমেট দিবস। দিনটি উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে...
বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ
0
minutes
spot_imgspot_img