ডাইনোসর বিলুপ্ত, তবু টিকে গেল কুমির: রহস্য উন্মোচন

পৃথিবী থেকে একসময় হারিয়ে গেছে বিশালাকার ডাইনোসর। প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে এক গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু সেই মহাবিপর্যয়ের পরও টিকে থাকে কুমিরের পূর্বপুরুষেরা। কোটি কোটি বছর ধরে নানা প্রাকৃতিক পরিবর্তনের মধ্যেও কীভাবে অস্তিত্ব ধরে রাখল এই প্রাণী? নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বলছেন, উষ্ণ জলবায়ুর প্রতি দীর্ঘদিনের অভিযোজন কুমিরের টিকে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুমির, অ্যালিগেটর, কেইম্যান ও ঘড়িয়ালসহ কুমিরজাতীয় প্রাণীর বিবর্তনীয় ইতিহাস ২৪ কোটি বছরেরও বেশি পুরোনো। ডাইনোসর ও স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো নানা ধরনের পরিবেশে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার পরিবর্তে এই প্রাণীগোষ্ঠী মূলত উষ্ণ পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল থেকেছে। গবেষকদের ধারণা, উপযুক্ত জলবায়ু অনুসরণ করার এই প্রবণতা তাদের দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসে টিকে থাকতে সহায়তা করেছে।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের জীবাশ্মবিদ আলফিও আলেসান্দ্রো কিয়ারেনজা ও তাঁর সহকর্মীরা এ গবেষণা পরিচালনা করেন। গবেষকেরা ৪০০টিরও বেশি বিলুপ্ত ও বর্তমান প্রজাতির বিবর্তনীয় সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। পাশাপাশি তাঁরা সাত হাজারের বেশি জীবাশ্ম ও ভৌগোলিক তথ্য এবং পৃথিবীর অতীত জলবায়ুর ৫২টি পুনর্গঠন ব্যবহার করেছেন।

জলবায়ুর সঙ্গে বদলেছে বসবাসের এলাকা

গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়লে কুমিরজাতীয় প্রাণীদের বসবাসের উপযোগী এলাকা মেরু অঞ্চলের দিকে বিস্তৃত হয়েছে। অন্যদিকে পৃথিবী ঠান্ডা হলে তাদের উপযোগী আবাসস্থল আবার নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে সরে গেছে।

অর্থাৎ, জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের টিকে থাকার উপযোগী পরিবেশের অবস্থানও বদলেছে এই প্রাণীগোষ্ঠী।

প্রায় ৫ কোটি বছর আগে পৃথিবীর জলবায়ু ছিল অত্যন্ত উষ্ণ। সে সময় উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এমনকি অ্যান্টার্কটিকার উচ্চ অক্ষাংশের এলাকাতেও কুমিরজাতীয় প্রাণীর বসবাস ছিল বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। বর্তমানের তুলনায় অনেক ঠান্ডা অঞ্চলেও তখন উষ্ণ পরিবেশের কারণে তাদের বসবাসের সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

এই তথ্য কুমিরের বিবর্তন বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি দেখায় যে কুমিরজাতীয় প্রাণীদের বিস্তার শুধু তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করেনি; পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনও তাদের বসবাসের সীমানা নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে।

গ্রহাণুর আঘাতেও কীভাবে টিকে গেল কুমির?

প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের কাছে চিকশুলুব এলাকায় আছড়ে পড়ে বিশাল এক গ্রহাণু। এর অভিঘাতে পৃথিবীর পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া ধুলা ও অন্যান্য পদার্থ সূর্যের আলোকে বাধাগ্রস্ত করে। তাপমাত্রা কমে যায়, উদ্ভিদের উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং খাদ্যশৃঙ্খলে দেখা দেয় বিপর্যয়। এর ফলে ডাইনোসরসহ পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে পাখিদের পূর্বপুরুষ হিসেবে পরিচিত কিছু ডাইনোসর বংশধর টিকে ছিল।

গবেষকদের জলবায়ু মডেল বলছে, গ্রহাণুর আঘাতের পরও উষ্ণমণ্ডলীয় ও উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের কিছু এলাকায় কুমিরের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ বজায় ছিল। ফলে নিরক্ষরেখা ও তার আশপাশের অঞ্চলে থাকা কিছু কুমিরজাতীয় প্রাণী তুলনামূলকভাবে অনুকূল পরিবেশে টিকে থাকার সুযোগ পেয়ে থাকতে পারে।

গবেষণার প্রধান লেখক কিয়ারেনজার মতে, গ্রহাণুর আঘাতে সৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয় সব প্রাণীগোষ্ঠীকে একইভাবে প্রভাবিত করেনি। কুমিরের বসবাসের উপযোগী কিছু পরিবেশ টিকে থাকলেও ডাইনোসরদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল।

তবে কেবল জলবায়ুই কুমিরের টিকে থাকার একমাত্র কারণ ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। গবেষণাটি বরং দেখায়, উপযুক্ত আবাসস্থল ও প্রাণীটির নিজস্ব শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় এই সাফল্যে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।

কম খাবারেও টিকে থাকার বিশেষ ক্ষমতা

কুমিরের বেঁচে থাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তাদের কম বিপাকীয় চাহিদা। কুমির শীতল রক্তের প্রাণী। অর্থাৎ, স্তন্যপায়ীদের মতো শরীরের তাপমাত্রা স্থির রাখতে তাদের বিপুল পরিমাণ শক্তি ব্যয় করতে হয় না। ফলে একই আকারের অনেক উষ্ণ রক্তের প্রাণীর তুলনায় তাদের খাবারের প্রয়োজনও কম হতে পারে।

গ্রহাণুর আঘাতের পর সূর্যের আলো কমে যাওয়ায় উদ্ভিদের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল। এর প্রভাব পড়েছিল প্রাণীদের খাদ্যশৃঙ্খলে। খাবারের সংকটের এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় না খেয়ে টিকে থাকার ক্ষমতা কুমিরের জন্য সুবিধাজনক হয়ে থাকতে পারে।

এ ছাড়া প্রতিকূল পরিবেশে শক্তি সাশ্রয় করার মতো শারীরবৃত্তীয় সক্ষমতাও তাদের রয়েছে। খরার সময় কোনো কোনো কুমির গর্তে আশ্রয় নেয় বা কাদার মধ্যে নিজেদের ঢেকে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। এ সময় তাদের বিপাকীয় কার্যক্রম কমে যায় এবং শক্তির ব্যবহার সীমিত হয়।

তবে বর্তমানের কুমিরের এসব বৈশিষ্ট্যকে সরাসরি কোটি কোটি বছর আগের প্রতিটি প্রজাতির ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ করা যায় না। প্রাচীন কুমিরজাতীয় প্রাণীদের জীবনযাপন ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যে বৈচিত্র্য ছিল। তাই তাদের টিকে থাকার ইতিহাস বুঝতে জীবাশ্ম, বিবর্তনীয় সম্পর্ক ও অতীত পরিবেশের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কুমিরের পূর্বপুরুষেরা ছিল বৈচিত্র্যময়

আজকের কুমিরজাতীয় প্রাণীদের দেখলে মনে হতে পারে, তাদের পূর্বপুরুষেরাও বুঝি একই ধরনের জীবনযাপন করত। কিন্তু বিবর্তনের ইতিহাস বলছে, এই গোষ্ঠীর মধ্যে একসময় নানা ধরনের প্রাণী ছিল। কিছু ছিল স্থলচর শিকারি, কিছু তৃণভোজী, আবার কিছু বাস করত সামুদ্রিক পরিবেশে। বিশালাকৃতির শিকারিও ছিল তাদের মধ্যে।

বর্তমানের কুমির, অ্যালিগেটর, কেইম্যান ও ঘড়িয়াল সেই দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসের টিকে থাকা অংশ। তাদের পূর্বপুরুষেরা বিভিন্ন সময়ে জলবায়ু ও পরিবেশের পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছে। কোনো কোনো শাখা বিলুপ্ত হয়েছে, আবার কিছু শাখা টিকে থেকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্ম দিয়েছে।

নতুন গবেষণাটি সেই দীর্ঘ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সামনে এনেছে। উষ্ণ জলবায়ুর ওপর নির্ভরতা, উপযোগী পরিবেশের অবস্থান অনুসরণ করার প্রবণতা এবং কম খাবারে টিকে থাকার সক্ষমতা, সব মিলিয়ে কুমিরজাতীয় প্রাণীদের অস্তিত্ব টিকে থাকার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।

ডাইনোসরদের বিলুপ্তির কাহিনি তাই শুধু হারিয়ে যাওয়া প্রাণীদের ইতিহাস নয়। এটি এমন প্রাণীগোষ্ঠীর ইতিহাসও, যারা বিপর্যয়ের মধ্যেও টিকে থাকার পথ খুঁজে পেয়েছিল। কোটি কোটি বছর পরও কুমিরের অস্তিত্ব সেই দীর্ঘ বিবর্তনীয় অভিযোজনেরই এক বিস্ময়কর সাক্ষ্য।

আরও পড়ুন

উটের চোখের পানিতে ২৬ সাপের বিষের প্রতিষেধক, দাবিটি কতটা সত্য?

উটের চোখের পানিতে এমন অ্যান্টিবডি রয়েছে, যা দুই ডজনেরও বেশি প্রজাতির বিষধর সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবি কৌতূহল...
জাতীয়
0
minutes

মিঠাপানির প্রবাহ কমায় বদলে যাচ্ছে সুন্দরবনের উদ্ভিদসমাজ, বাড়ছে কাঁকড়া গাছ

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে এক দশকের ব্যবধানে বীজ থেকে চারা জন্মানোর হার কমেছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ সময়ে...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

নিরাপত্তা বোধ করায় শাবকদের নিয়ে ধানখেতে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম হাতির পালের

সাধারণত কৃষিজমির মাঝখানে একসঙ্গে অনেক হাতিকে শুয়ে বিশ্রাম নিতে দেখা যায় না। তবে ভারতের আসাম রাজ্যের সবুজ ধানখেতের মাঝে কাদামাটির একটি জায়গায় এশীয় হাতির...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes

পরিবেশ রক্ষায় সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়তি উদ্যোগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

পরিবেশ ও বন রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরেও উদ্যোগী হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের...
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য
0
minutes
spot_imgspot_img